• ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশাল সিটি করপোরেশন: দুদকের অনুসন্ধানে ফেঁসে যাচ্ছে জনসংযোগ কর্মকর্তা রোমেল

দখিনের বার্তা
প্রকাশিত এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১৬:৩৮ অপরাহ্ণ
বরিশাল সিটি করপোরেশন: দুদকের অনুসন্ধানে ফেঁসে যাচ্ছে জনসংযোগ কর্মকর্তা রোমেল
সংবাদটি শেয়ার করুন....

বরিশাল অফিস :   বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, আইটি অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদনে অন্তত ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে প্রায় ১০ জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেলের নাম। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কাজ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। দুদক এখনো কোনো মামলা দায়ের করেনি এবং অনুসন্ধান প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে এ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দায়িত্ব গ্রহনের পরই সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছেন।তিনি বিসিসিতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য সোচ্চার রয়েছেন।

 

দুদক সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সিটি করপোরেশনের কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়। তদন্তের আওতায় আনা হয় আইটি প্রকল্প, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ব্যয়।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ৯ ও ১০ জুলাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তাদের সম্পদের বিবরণ, প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

 

আরও পড়ুন:

বিসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রোমেল চাকুরির আড়ালে ঠিকাদারও

 

দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“প্রাথমিক পর্যায়ে অনিয়ম পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আইটি ও ডিজিটাল প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।”

তবে তিনি  উল্লেখ করেন যে, অনুসন্ধান এটি কেবলমাত্র পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করে।

 অভিযোগের কেন্দ্রে কে আহসান উদ্দিন রোমেল?

বরিশাল সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেল দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। অভিযোগপত্র ও একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, তিনি একই সঙ্গে আইটি সংশ্লিষ্ট কিছু দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং কিছু প্রকল্পে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত থেকেছেন।

অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

* সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল দেখানো
* অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থায় অনিয়ম ও বিলম্ব
* বিভিন্ন আইটি প্রকল্পে বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো
* ব্যক্তিগত আইটি প্রতিষ্ঠান  পিপলো বিডি দিয়ে ব্যবহার করে প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার
* সরকারি প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন ব্যয়ে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন

এসব অভিযোগ বিভিন্ন অভিযোগকারী ও অভ্যন্তরীণ নথির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা যায়।

 আইটি প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ

অভিযোগপত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের ডিজিটালাইজেশন প্রকল্পগুলোকে।

সূত্রের দাবি অনুযায়ী, অনলাইন ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বা মাঝপথে ব্যাহত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বাস্তবায়নে যে প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত ছিল, তাদের কাজের বিল ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে অনিয়ম হয়েছে।

একটি অভিযোগে বলা হয়, একটি স্থানীয় আইটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করলেও যথাযথ বিল না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে, পরবর্তীতে সেই প্রকল্পে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পুনরায় বাজেট প্রস্তাব করা হয় বলে দাবি করা হয়।

একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্পের বাস্তব ব্যয় এবং প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। যেখানে বিশেষজ্ঞদের মতে কিছু কাজ তুলনামূলক কম খরচে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল, সেখানে কয়েক কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়।

সিসিটিভি প্রকল্প: অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ

সিটি করপোরেশনের সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সংখ্যক ক্যামেরা দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল তোলা হয়েছে এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি খরচ দেখানো হয়েছে।

একটি সূত্রের দাবি, প্রকল্পের কাজের পরিমাণ এবং বিলের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো মূল্যায়ন বা যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আহসান উদ্দিন রোমেলের একটি ব্যক্তিগত আইটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্পে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এই অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রকল্পে ঠিকাদার নির্বাচন, বিল অনুমোদন এবং কাজের তদারকিতে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আদালতের রায় বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।

 প্রচার-প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রম—যেমন ব্যানার, ফেস্টুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা—এসব খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব কাজের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিল দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, নির্দিষ্ট একটি প্রচারণা কাজে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বতন্ত্র আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

 

অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত

সূত্রগুলো বলছে, বিসিসির অভ্যন্তরে কিছু প্রকল্প ও বিল অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ছিল। কিছু প্রকল্পে একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

একটি সূত্র দাবি করে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদন ও বিল আটকে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

 রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব

সূত্রগুলো আরও জানায়, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে কিছু প্রকল্প স্থগিত এবং পরে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অংশ এবং এর সঙ্গে সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ সম্পর্কিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

 ছাত্র আন্দোলন ও জনমতের চাপ

বরিশালে সম্প্রতি কিছু ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন দুর্নীতির অভিযোগে দাবি তুলেছে। তাদের প্রধান দাবি—অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

একজন আন্দোলনকারী বলেন,
“আমরা চাই স্বচ্ছ তদন্ত হোক। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।”

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

 দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

দুদক সূত্র বলছে, অনুসন্ধান প্রতিবেদন এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কমিশন অনুমোদন দিলে মামলা দায়ের হবে।

 

 অভিযুক্তদের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া

এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে আহসান উদ্দিন রোমেল বা সংশ্লিষ্ট অন্যদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাধারণত এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তদন্ত চলাকালে মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন ।

 অভিযোগ বনাম প্রমাণ

দুর্নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং অভিযোগপত্র প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য হিসেবে গণ্য হয়। এগুলোকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অডিট রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।

একজন প্রশাসনিক বিশ্লেষক বলেন,
“সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে, কিন্তু সব অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়া অপরিহার্য।”

বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা এখনো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদন এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি চূড়ান্ত রায় নয়।

আহসান উদ্দিন রোমেলসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণিত হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী আইনি তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।

ততক্ষণ পর্যন্ত এসব অভিযোগকে “অভিযোগ” হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে—যার সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন আইনি প্রক্রিয়ার হাতে।