স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরিশালে দুই প্রকৌশলীর বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বদলির নির্দেশ কার্যকর হওয়ার আগেই তা বাতিলের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালানো হচ্ছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সদর উপজেলার উপজেলা প্রকৌশলী সৈয়দ মাইনুল মাহমুদ এবং বরিশাল জেলার নির্বাহী প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইয়াছিন মিয়া।
অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন এবং অতীত রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রশাসনিক বলয় এখনো সক্রিয় রয়েছে। আর সেই বলয়ের স্বার্থ রক্ষার অংশ হিসেবেই বদলির আদেশ ঠেকানোর চেষ্টা চলছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বদলির আদেশ কী ছিল?
এলজিইডির ১১ জুন ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশ (স্মারক নং-৪৬.০২.০০০০.০০১.৯৯.২৭১.১৮-৫৮৪০) অনুযায়ী, সৈয়দ মাইনুল মাহমুদকে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়।
একই দিনে জারি হওয়া আরেকটি অফিস আদেশে (স্মারক নং-৪৬.০২.০০০০.০০১.৯৯.২১৭.২১-৫৮৪৩) সহকারী প্রকৌশলী মো. ইয়াছিন মিয়াকে ঝালকাঠি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে পদায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আদেশ জারির পরপরই তা বাতিলের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও তদবির শুরু হয়।
কার মাধ্যমে তদবিরের অভিযোগ?
একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, বদলির আদেশ বাতিলের লক্ষ্যে বরিশাল জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল ইমরান এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য রহমত-ই-খুদার মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঝালকাঠি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে শুরু করে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বদলির আদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈয়দ মাইনুল মাহমুদ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বরিশাল সদর উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি একই কর্মস্থলে অবস্থান করে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। সরকারি চাকরির নীতিমালায় দীর্ঘ সময় একই স্থানে অবস্থান নিরুৎসাহিত করা হলেও তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠতার কারণে বহাল ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে তৎকালীন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তিনি দীর্ঘ সময় একই পদে দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তাদের ভাষ্য, ওই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
ইয়াছিন মিয়াকে ঘিরেও একই অভিযোগ
সহকারী প্রকৌশলী মো. ইয়াছিন মিয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন একই জেলায় কর্মরত থাকার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বরিশালে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ওই সময়ে জেলার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।
সূত্রগুলোর দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহসহ জেলার একাধিক সংসদ সদস্যের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি ভূমিকা রাখতেন।
‘সিন্ডিকেট’ ভাঙার আশঙ্কাই কি বদলি ঠেকানোর কারণ?
অভিযোগকারীদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পুনর্বিন্যাস শুরু হলেও বরিশাল এলজিইডিতে গড়ে ওঠা প্রভাব বলয় পুরোপুরি ভাঙেনি।
তাদের দাবি, বদলির আদেশ কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত এই নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বরিশালেই থেকে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, সৈয়দ মাইনুল মাহমুদ বরিশাল জেলার নির্বাহী পৌর কৌশল দপ্তরে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়নের জন্যও জোরালো তদবির করছেন।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অবস্থান কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি অনিয়মের প্রমাণ না হলেও এতে প্রভাব বলয়, স্বার্থের সংঘাত এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এ কারণে নিয়মিত বদলি ও রোটেশন ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বরিশাল এলজিইডির এই ঘটনায়ও মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—বদলির আদেশ কি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি তা বাতিলের জন্য সত্যিই কোনো প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে?
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং বদলির আদেশের চূড়ান্ত বাস্তবায়নই এ প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে।