• ১৪ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশাল নগরীর কেডিসিতে মাদকের খোলা হাট: বেচাকেনায় অর্ধশত সিন্ডিকেট, নেপথ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক

দখিনের বার্তা
প্রকাশিত আগস্ট ১৪, ২০২৬, ০১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
বরিশাল নগরীর কেডিসিতে মাদকের খোলা হাট: বেচাকেনায় অর্ধশত সিন্ডিকেট, নেপথ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক
সংবাদটি শেয়ার করুন....

​বরিশাল প্রতিনিধি:
গরু কিংবা ছাগলের হাটের কথা সবার জানা থাকলেও বরিশাল নগরীতে সন্ধান মিলেছে এক অভিনব ‘মাদকের হাটের’। নগরীর বান্দ রোডস্থ কেডিসি কলোনিতে প্রতিদিনই বসছে এই হাট। খুচরো নয়, এখানে সব ধরনের মাদক বিক্রি হয় পাইকারি দরে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অর্ধশত মাদক বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা এই হাটে দিনে অন্তত ২০ কেজি গাঁজা এবং কয়েক হাজার পিস ইয়াবা কেনাবেচা হচ্ছে।
​মাদক বিক্রির পাশাপাশি এলাকাটি মাদক সেবন এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান স্পটে পরিণত হয়েছে।
​পট পরিবর্তনে ‘স্বর্গরাজ্য’ কেডিসি
​দীর্ঘদিন ধরে কেডিসি কলোনিতে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললেও, সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তা আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে কলোনিটি বর্তমানে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। অভিযানের ভয় না থাকায় যেসব ব্যবসায়ী এতদিন কিছুটা আড়ালে ছিলেন, তারাও এখন পুরোদমে মাঠে নেমেছেন।
​পরিবারভিত্তিক ব্যবসা ও শীর্ষ সিন্ডিকেট
​অনুসন্ধানে কলোনিতে অন্তত ৫০ জন সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ীর নাম পাওয়া গেছে। চমকপ্রদ বিষয় হলো, কলোনির বেশ কিছু পরিবারে মা-বাবা থেকে শুরু করে সন্তানেরাও সরাসরি এই ব্যবসার সাথে জড়িত।
​প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা:
ছনিয়া, মিলন, ময়না, মানিক, শামীম, জুয়েল, নিলু, রুবেল ওরফে খোঁচা রুবেল, নাজমা গ্রুপের আসমা মিঠু, রাসেল ফার্মেসি, লিটন, ডিশ রনি, আজাদ, জালাল, খলিলসহ একাধিক চক্র। (সম্প্রতি ৬৬ কেজি গাঁজাসহ আটক হন মালেকের স্ত্রী)।
​রক্ষাকবচ ‘দুলিয়া’ ও ‘পাহারাদার’ পারু
​কলোনির পুরো মাদক সিন্ডিকেটটি টিকে আছে সুনির্দিষ্ট কিছু আড়াল ও পাহারাবেষ্টনীর ওপর:
​দুলিয়া বেগম (আশ্রয়দাতা ও লবিস্ট): কাঠ ব্যবসার আড়ালে কলোনির সকল মাদক কারবারিকে আশ্রয় দেন তিনি। সিংহভাগ মাদক তার জিম্মায় রাখা হয়। এছাড়া কেউ আটক হলে তাকে ছাড়িয়ে আনার লবিংয়ের দায়িত্বও তিনি সামলান।
​পারু (ইনফরমার/পাহারাদার): নিজেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী পরিচয়ে পরিচিত এই নারীর কাজ কলোনির প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখা। পুলিশ বা যৌথ বাহিনী এলেই তিনি সংকেত পাঠিয়ে দেন ব্যবসায়ীদের। বিনিময়ে মাদক সিন্ডিকেট থেকে দৈনিক তার আয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।
​বিক্রি ছড়িয়েছে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পার্কে
​শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকের দলে ৫ থেকে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। মূল প্রধানের নির্দেশ অনুযায়ী গ্রাহকের হাতে মাদক পৌঁছে দেওয়াই এদের কাজ। দিনের বেলায় বেচাকেনা কিছুটা কম হলেও সন্ধ্যা নামলেই জমে ওঠে মাদকের বাজার।
​বর্তমানে কেডিসি কলোনির সীমানা ছাড়িয়ে এই মাদকের প্রভাব গিয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী বেলস পার্ক ও বরিশাল মডেল কলেজসহ আশপাশের এলাকায়। সেখানেও দিনরাত খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
​আইনি পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
​সম্প্রতি যৌথ বাহিনী কলোনিটিতে একটি অভিযান পরিচালনা করে দেশীয় অস্ত্রসহ দুইজনকে আটক করে এবং অল্প পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পরপরই ব্যবসায়ীরা পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে নতুন উদ্যমে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। অপরাধ দমনে দ্রুত ও চিরুনি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী।