২০১৫ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষে (রাজউক) সহকারী অথরাইজড অফিসার পদে যোগ দেন পলাশ সিকদার। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বেতন-ভাতা হিসেবে পেয়েছেন ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৮৪১ টাকা। অথচ বাড়ি-গাড়িসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। এসব সম্পদ তিনি ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। সংস্থাটির উপপরিচালক মানসী বিশ্বাস অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। দুদক ও রাজউক থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজউকের উত্তরা জোনের অথরাইজড অফিসার পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে পৌনে ১ কোটি টাকা মূল্যের হ্যারিয়ার গাড়ি, প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করে গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণসহ আরও অনেক সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে।
সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাসকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগের বিষয়ে ২০২৩ সালের ২১ জুন পলাশ সিকদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়, পলাশ সিকদার ২০১৫ সালে রাজউকের সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে যোগ দেন। তিনি সংস্থাটির পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় রাজউকের আওতাধীন এলাকায় বিভিন্ন ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তিনি ২০২১ সালে অথরাইজড অফিসার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর রাজউকের উত্তরা জোনে বদলি করা হয়। তিনি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বিসি কমিটির (ভবন নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন কমিটি) সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
দুদকের তথ্যমতে, সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে পলাশ সিকদারের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়ার পর তার সম্পদের বিস্তারিত জানতে চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দেশের সব ব্যাংক, রাজউক, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, পোস্ট অফিস ও রিহ্যাবসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পলাশ সিকদারের সম্পদ অর্জনের তথ্য বিভিন্ন দপ্তর থেকে দুদকে পাঠানো হয়। এর মধ্যে রাজউক থেকে পাঠানো বেতন-ভাতার হিসাবে বলা হয়েছে, তিনি ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত সময়ে বেতন-ভাতা হিসেবে পেয়েছেন ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৮১ টাকা। অথচ তার কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়, পলাশ সিকদারের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার পাটিকেলবাড়ী। তার পরিবার ১৯৮৮-৮৯ সালে ভূমিহীন হিসেবে ১০০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত নিয়েছিল। এখন সেই পরিবার বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক। রাজউকে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর যেসব সম্পদের মালিক হয়েছে পলাশ সিকদারের পরিবার, তার মধ্যে রয়েছে গ্রামের বাড়িতে ২ কোটি টাকা খরচ করে দোতলা বাড়ি নির্মাণ, বাবার নামে ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে নেছারাবাদ উপজেলার ব্যাসকাঠি মৌজায় ১ একর ২৫ শতাংশ জমি ক্রয়, মেজো বোন সেলিনা আক্তার রেবুর জন্য ৫০ লাখ দিয়ে দোতলা বাড়ি নির্মাণ, স্ত্রীর ছোট ভাইয়ের নামে বসুন্ধরার এন-ব্লকে পাঁচ কাঠার প্লটে ভবন নির্মাণকাজ শুরু করা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, পলাশ সিকদার যে হ্যারিয়ার গাড়িটি (নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৭-৭৯০২) ব্যবহার করেন, তার মূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গাড়িটি তার নিজের নামে কেনা হয়নি, এটি আফসানা মরিয়মের নামে এক নারীর নামে কেনা হয়েছে। পলাশ সিকদারের বাবা নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনকালে প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ করেন। এ ছাড়া তিনি শ^শুরবাড়িতে অনেক সম্পদ কিনেছেন এবং ব্যাংক-ব্যালান্স করেছেন। সব মিলিয়ে তার কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
রাজউক ও দুদকের তথ্যমতে, পলাশ সিকদার রাজউকে নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের দালালি করতেন। এ ছাড়া তিনি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ভবনের নকশার অনুমোদন দিতেন। তার বিরুদ্ধে রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তরে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ জমা হয়েছিল। পরে তার বিরুদ্ধে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। মন্ত্রণালয় সে অভিযোগের তদন্ত করছে। তদন্তকালে তাকে ওএসডি করা হয়।
এদিকে, পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দশতলা ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার ঘটনায় আরও একটি অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির একজন উপপরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল বিকেলে পলাশ সিকদারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।