• ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশাল ডিসির বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

দখিনের বার্তা
প্রকাশিত মে ৭, ২০২৬, ১৪:০২ অপরাহ্ণ
বরিশাল ডিসির বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
সংবাদটি শেয়ার করুন....

স্টাফ রিপোর্টার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় নির্বাহে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালনকারী ও বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকৃত বাস্তবতার চেয়ে জেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্র ও ভোট কক্ষের সংখ্যা বেশি দেখিয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ আত্মসাতের চেষ্টা হচ্ছে বলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে। তবে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় কেউ প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি নন, ফলে অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবী করেন টাকার পরিমানটা প্রায় ৬২ লক্ষ টাকা হতে পারে। জানা গেছে, চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি উপসচিব (নির্বাচন পরিচালনা-১) রাশেদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ১৭.০০.০০০০.০৩৭.৩৬.০১৬.২৫.৩৫ নম্বরের স্মারকের মাধ্যমে বরিশাল জেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনার জন্য মোট ১৩ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উক্ত বরাদ্দপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ব্যালট পেপার, বিভিন্ন প্রকার ফরম, প্যাকেট, ম্যানুয়াল ও অন্যান্য নির্বাচনী দ্রব্যাদি ভোটকেন্দ্রে প্রেরণ এবং নির্বাচন সমাপ্তির পর ভোটকেন্দ্রে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি রিটার্নিং অফিসার/সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নিকট ফেরত আনা বাবদ সাধারণ কেন্দ্রের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং দুর্গম কেন্দ্রের জন্য ৭ হাজার টাকা করে ব্যয় নির্ধারণের কথা উল্লেখ রয়েছে। বরিশাল জেলা সিনিয়র নির্বাচন অফিসার মো. রোকুনুজ্জামান স্বাক্ষরিত ১৭.০৬.০৬০০.০০০.৩৬.০৩৩.২৫.৭২৫ নম্বরের স্মারক সম্বলিত চিঠি থেকে জানা গেছে, বরিশাল জেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা মোট ১৯৫টি এবং দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ১৮৯৩টি। বিভিন্ন উপজেলা নির্বাচন অফিসের নথিতে দেখা যায়, দুর্গম কেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, বিভিন্ন উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যায় পার্থক্য এবং সংশোধনের বিষয় দেখা গেছে। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় প্রথমে দুর্গম ভোট কেন্দ্র ১০০টি উল্লেখ থাকলেও পরে তা সংশোধন করে ৫৫টি করা হয়। একই নথিতে দুর্গম ভোট কক্ষ ৬৩২টি উল্লেখ রয়েছে। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সাইদুর রহমানের ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত ১৭.০৬.০৬৬২.০০০.৩২.০০১.২৫-২২৪ নম্বর স্মারকে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। মুলাদী উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. নাজিম উদ্দিন ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত চিঠিতে মুলাদী উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৭২টি উল্লেখ থাকলেও পরে তা কেটে ৩৯টি করা হয় এবং ভোট কক্ষ ৪৩৭টি দেখানো হয়েছে। হিজলা উপজেলা নির্বাচন অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) তানজিলা ছারিন ইসলাম নাদিয়া ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত চিঠিতে দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৯টি উল্লেখ থাকলেও পরে তা কেটে ২৩টি করা হয়। একই উপজেলায় দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ৩১৮টি উল্লেখ রয়েছে। বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১০টি এবং দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫৮টি। উজিরপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসার জাহিদুল ইসলাম রুমি স্বাক্ষরিত চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৩৯টি এবং দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ২৫৯টি। বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার রেহেনা আক্তার স্বাক্ষরিত চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ২টি এবং দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ৮টি। বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. আমির খসরু গাজী স্বাক্ষরিত চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৬টি এবং দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ১০৪টি। বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১১টি এবং দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭৭টি। গৌরনদী উপজেলা নির্বাচন অফিসার বিশ্বাস সুজন কুমার স্বাক্ষরিত চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্র ও দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা শূন্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, বরিশাল জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্র ও দুর্গম ভোট কক্ষের সংখ্যা বেশি দেখিয়ে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার রিটার্নিং অফিসার ও বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে। সূত্রের দাবি জেলার তিনটি উপজেলা মুলাদী, মেহেন্দিগঞ্জ, হিজলা উপজেলায় দুর্গম ভোট কেন্দ্র ও ভোট কক্ষের বরাদ্দকৃত অর্থ এখনো সহকারী
রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেনি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে দুর্গম কেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যায় নথিগত ভিন্নতা কেন তৈরি হলো, সংশোধিত নথির অনুমোদন কে দিয়েছে, একই নির্বাচনে বিভিন্ন উপজেলার তথ্য কেন অসামঞ্জস্যপূর্ণ, বরাদ্দকৃত অর্থ এখনো মাঠপর্যায়ে কেন পৌঁছেনি, এবং অর্থ ছাড় না করেই কেন বিল-ভাউচার জমা দিতে বলা হচ্ছে। অথচ বরাদ্দকৃত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিস্টরা। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো এখনো যাচাইাধীন এবং স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে বলে সূত্রের দাবি। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের জেলা অফিসে ডেকে নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় সংক্রান্ত বিল-ভাউচার জমা দিতে বলা হয়েছে, কিন্তু আমরা এখনো কোনো টাকা হাতে পাইনি।” সূত্রের আরও দাবি, অর্থ না দিয়েই বিল-ভাউচার জমা দিতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা বিপাকে পড়েছেন বলেও একাধিক সূত্রের দাবি। একাধিক সূত্র দাবি করেছে, যেসব কর্মকর্তা ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য বা অনিয়ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাদের বিভিন্ন শাখায় বদলি করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার হালদারকে সাধারণ শাখা থেকে সরিয়ে জুডিশিয়াল মুন্সিখানা শাখায় বদলি করা হয়। সূত্রটির দাবী অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) লুজি কান্ত হাজিংকে মানব সম্পদ ও উন্নয়ন শাখায় বদলি করেন। পথের কাটা সরাতে সম্প্রতি তাকে জোর করে নৌ পরিবহন মন্ত্রাণালয়ে বদলি করতে ভূমিকা রাখেন জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমন এমনটাই অভিযোগ একাধিক সূত্রের। এছাড়াও সহকারী কমিশনার হাসিবুল আজমকে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনে বদলি করা হয়েছে বলে খবর মিলেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে দায়িত্বপালনকারী প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে বদলি ও পদায়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের অভিযোগও উঠেছে। চাকরী হারানোর ভয়ে কিংবা এসিয়ারে (কাজের বার্ষিক মূল্যায়ন রিপোর্ট)-এ আপত্তিকর প্রতিবেদনের ভয়ে মিডিয়ার কাছে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছে না। এ বিষয়ে মুলাদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. গোলাম সরওয়ার বলেন, “আপনাদের নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রয়োজন হলে উপজেলা নির্বাচন অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।” পরে তিনি কল কেটে দেন। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রিয়াজুল রহমান এবং হিজলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইলিয়াস সিকদারের সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।