নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালের হিজলা উপজেলার সদ্য সরকারিকৃত কলেজ সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এইচ এম আবদুস সালামের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষক এবং অভিভাবকবৃন্দ, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে। সাধারণ হিজলাবাসী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা ছিল একজন বিসিএস ক্যাডার প্রফেসর অধ্যক্ষের দায়িত্বে আসীন হোন। সে আশা পূরণ হলেও তা প্রতিষ্ঠানটির জন্য বয়ে এনেছে সীমাহীন অস্বচ্ছতা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব। অভিযোগ আছে, প্রফেসর সালাম কলেজের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন বন্ধের দিনে তার বরিশালের বাসায় কিছু অশিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পূর্বে তিনি কৌশলে এসিআরে নম্বর কম দেওয়ার হুমকি দিয়ে শিক্ষকদের প্রতিবাদ করা থেকে বিরত রাখেন।
সম্প্রতি কোনো বোর্ড মিটিং কিংবা আলোচনা ছাড়াই তিনি তার নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী শিক্ষক পরিষদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি ঘোষণা করেন। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করে গত ১৭ মে রবিবার নোটিশের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আহ্বান করেন এবং মিটিংয়ের শেষভাগে আগে থেকেই প্রস্তুতকৃত শিক্ষক পরিষদের কমিটির নামে একটি কাগজ বের করে পরিষদের পদবী এবং নাম ঘোষণা করেন। কমিটি ঘোষণার পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি শিক্ষকদের এসিআরসহ বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখ করে হুমকি দেন যাতে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস না করে। কলেজের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের প্রভাষক জনাব আরিফুর রহমান কিছু বলতে চাইলে তাকে সকলের সামনে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন, যাতে উপস্থিত সকলে হতাশ হয়ে পড়েন এবং মর্মাহত হন।
শিক্ষক পরিষদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি ঘোষণার পূর্বে একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, বিশ্লেষণ, শিক্ষকদের অংশগ্রহণে কোন প্রকার নির্বাচনের আহ্বান এবং অনুমোদন ছাড়া শুক্র-শনিবারের বন্ধে কোনো প্রস্তুতিমূলক সভা-আলোচনা না করে কিভাবে একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদ গঠিত হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষক মন্ডলী এবং সচেতন এলাকাবাসী।
প্রফেসর আব্দুস সালাম একজন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি উপজেলার অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের তার বক্তব্যে হেয় করে কথা বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং আমাদের অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার বক্তব্যের কিছু রেকর্ডিং সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি এবং প্রমাণ পেয়েছি।
শুধু শিক্ষক পরিষদ গঠনই নয়, তিনি কলেজ পরিচালনার জন্য একটি নীতি নির্ধারণের কমিটিও করেছেন এবং সেটিও গোপনে। অনুসন্ধান করে দেখা যায়, নীতি নির্ধারণ কমিটিতে যারা রয়েছেন, তাদের নিয়েই আবার শিক্ষক পরিষদের কমিটি গঠিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদটি দেওয়া হয়েছে অত্র কলেজের প্রভাষক মোঃ বেলায়েত হোসেনকে, যিনি শারীরিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ, অন্যের সাহায্য নিয়ে চলতে হয় এবং অসুস্থতার কারণে হাতের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় নিজের হাতে লিখতেও অক্ষম। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদটি দেওয়া হয়েছে অত্র কলেজের আরেকজন শিক্ষক মোঃ লোকমান হোসেনকে। লোকমান হিজলা উপজেলায় সুপরিচিত একটি নাম তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সহিংসতায় সশরীরে অংশগ্রহণের জন্য। তিনি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এবং হিজলা উপজেলা আওয়ামীলীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। তিনি উপজেলার দুটি সহিংস গ্রুপের একটি অর্থাৎ টিপু শিকদার গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনি একাধিকবার নিজে উপস্থিত থেকে সহিংসতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিষয়টি কারো অজানা নয়। হিজলা কলেজে ছিল তার যথেষ্ট আধিপত্য। কলেজের সকল কমিটি দীর্ঘ ১৭ বছর তার হাতে জিম্মি ছিল। প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় কেউ এসবের প্রতিবাদ করতে কখনো সাহস পায়নি।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে উপজেলার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানে আবদুস সালামদের হাত ধরে কিভাবে এই অপশক্তি আবারও এভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা নিয়ে সাধারণ শিক্ষক ও জনমনে প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, প্রফেসর আব্দুস সালাম বিগত সরকারের সময় সরকারি বিএম কলেজের ইংরেজি বিভাগে সদর্পে প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন, পরবর্তীতে সরকারি হাতেম আলী কলেজের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জানা যায়, তৎকালীন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শওকত হোসেন হিরন এবং পরবর্তীতে তার স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজ এমপির সাথে আবদুস সালামের সুসম্পর্ক ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ৬ জন শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলে উল্লেখিত সকল তথ্যের মিল এবং সত্যতা পাওয়া গেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্বজনপ্রীতির আখড়ায় পরিণত হলে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে শিক্ষার্থীরা, পাঠদানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না সাধারণ শিক্ষকরা, অভিভাবকদের মধ্যে থাকবে হতাশা এবং এলাকাবাসীর মাঝে বিরাজ করবে চাপা ক্ষোভ।