• ১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে দুর্নীতির মহোৎসব: রোগীদের খাবারে ভাগ বসাচ্ছেন আরএমও ও ঠিকাদার!

দখিনের বার্তা
প্রকাশিত এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১২:১২ অপরাহ্ণ
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে দুর্নীতির মহোৎসব: রোগীদের খাবারে ভাগ বসাচ্ছেন আরএমও ও ঠিকাদার!
সংবাদটি শেয়ার করুন....

মোঃ আনোয়ার হোসেন .. পহেলা বৈশাখের বিশেষ দিনটিতেও অনিয়ম আর দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পেল না বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালের রোগীরা। উন্নতমানের খাবার বরাদ্দ থাকলেও আরএমও (আবাসিক মেডিকেল অফিসার) এবং ঠিকাদারের যোগসাজে রোগীদের দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের এবং পরিমাণে কম খাবার। শুধু তাই নয়, ভুয়া রোগী দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং চিকিৎসকদের চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।
সরেজমিনে গতকাল ১৪ এপ্রিল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত উন্নতমানের খাবারের সাথে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। রেজিস্ট্রারে থাকা রোগীর সংখ্যার সাথে শয্যায় থাকা রোগীর সংখ্যার ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত রোগীর নাম দেখিয়ে বরাদ্দকৃত টাকা পকেটস্থ করার অভিযোগ উঠেছে আরএমও এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমও ডাক্তার মলয় কৃষ্ণন বলায় দায়সারাভাবে বলেন, “দুই-একটি গরমিল থাকতেই পারে, তাতে কী হয়?” খাবারের কম পরিমাণের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার অবস্থা আরও ভয়াবহ। ২৪ ঘণ্টা পার হলেও কোনো ডাক্তার রাউন্ডে আসেননি বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষুব্ধ রোগীরা। স্বজনরা জানান, ডাক্তারদের ডাকলে বা অনিয়মের প্রতিবাদ করলে সরাসরি ‘শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে’ রেফার করার হুমকি দেওয়া হয়। রেফারের ভয়ে অনেক রোগী মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ও শিশুদের ভোগান্তি দিনদিন বেড়েই চলছে। শয্যা সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ওষুধ না পাওয়া এবং ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুকেই হাসপাতালের মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। ভর্তি থাকা এক শিশুর স্বজন রেশমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ছয়দিন ধরে এক বছরের বাচ্চা নিয়ে ফ্লোরে পড়ে আছি। আমাদের কোনো বিছানার চাদর কিংবা ফোম কিছুই দেওয়া হয়নি। আমরা বড়রা কোনোমতে থাকতে পারলেও ছোট বাচ্চা নিয়ে এই মেঝেতে থাকা অসম্ভব। তার ওপর ঠিকমতো খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না।”
হাসপাতালের টয়লেটগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, “টয়লেটে যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নেই। এসব সমস্যার কথা বললে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উল্টো আমাদের ধমক দিয়ে বলেন ভালো পরিবেশ চাইলে শেরে ই বাংলা হাসপাতালে যান।”
গাইনি ওয়ার্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। নলচর থেকে আসা রোগীর স্বজন হালিমা বলেন, “আমার আত্মীয় দুই দিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় এখানে পড়ে আছে, কিন্তু কোনো ডাক্তার তাকে দেখতে আসেনি। আসলে গরিব মানুষের জন্য কোথাও কোনো জায়গা নেই।” একই চিত্র ডায়রিয়া ওয়ার্ডেও। খাদিজা নামে এক রোগী জানান, বেশিরভাগ ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে এবং ডাক্তারদের সময়মতো দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
রোগীদের ভাষ্যমতে, হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগেই অবহেলা আর অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে। সরকারি সুবিধা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও, ভোলার এই হাসপাতালে চিকিৎসার নামে চলছে চরম ভোগান্তি। অসহায় রোগীদের আক্ষেপ— “আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর বলার কেউ নেই।”
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। এক সপ্তাহ ধরে একই বিছানার চাদর ব্যবহার করছেন রোগীরা, যা ধোয়া বা পরিষ্কার করা হয়নি। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থেকে সুস্থ হওয়ার বদলে রোগীরা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মনজুরুল এ লাহী জানান, “অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখে এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীদের সেবা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।”
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে সাধারণ মানুষের সরকারি চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও হারিয়ে যাবে। পর্ব-১