ছুটি না নিয়ে কক্সবাজারে পাঁচদিনের আনন্দ ভ্রমন, শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়ম বহির্ভূতভাবে সাংবাদিকের কার্ড ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, স্কুল চলাকালীন সাংবাদিকতার কাজের কথা বলে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত, দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম ও উদাসীনতার অভিযোগে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শনিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রিফাত আরা মৌরি বলেন, সরকারি নীতিমালায় শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা একসাথে করার বিধান নেই।
ছুটি না নিয়েই প্রধানশিক্ষক স্ব-পরিবারে কক্সবাজারে আনন্দ ভ্রমনে গিয়েছিলো। সার্বিক বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে আহবায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযুক্ত মুহাম্মদ শাহিন গৌরনদী উপজেলার চাঁদশী ইউনিয়নের নাঠৈ রিজিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক এং ফারহান হোসেন নান্নু নলচিড়া ইউনিয়নের গরঙ্গল দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তারা দুইজনেই শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
সূত্রমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গোপালগঞ্জ জেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরির সূত্রে মুহাম্মদ শাহিন এবং আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হওয়ায় ফারহান হোসেন নান্নু গৌরনদী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারিছুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন হয়ে ওঠেন।
হারিছের একক রাজনৈতিক অধিপত্যকে ব্যবহার করে ওই দুই শিক্ষক স্থানীয় শিক্ষক সমাজ ও এলাকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। এমনকি হারিছের রাজনৈতিক তদবিরে প্রায় আড়াই বছর আগে গৌরনদীর নাঠৈ রিজিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক পদে মুহাম্মদ শাহিন এবং আট বছর আগে ফারহান হোসেন নান্নু গরঙ্গল দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান।
অভিযোগ রয়েছে, হারিছের প্রভাবে শিক্ষকতার পাশাপাশি ওই দুই শিক্ষক সাংবাদিকতার পেশায় নিজেদের জড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা করে অধিকাংশ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। এতে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি বিগত পতিত সরকারের সময় স্থানীয় পেশাজীবী সাংবাদিকদের দমিয়ে রাখতে হারিছের প্রতিষ্ঠিত গৌরনদী উপজেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতৃত্বে ছিলেন ওই দুই শিক্ষক। এরইমধ্যে গতবছরের ৫ আগস্টের পর রাতারাতি রাজনৈতিক ভোল্টপাল্টে ফেলেন ওই দুই শিক্ষক।
জানা গেছে, ছুটি না নিয়ে গত ২৮ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষকতার আড়ালে সাংবাদিকতার প্রভাব খাটিয়ে একটি সাংবাদিক সংগঠনের আনন্দ ভ্রমনে স্ব-পরিবারে কক্সবাজারে ছিলেন প্রধানশিক্ষক মুহাম্মদ শাহিন ও সহকারী শিক্ষক ফারহান হোসেন নান্নু। এ সময় তারা দুইজনই পরিবার নিয়ে কক্সবাজারের ‘রিম রিসোর্ট’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন।
ঘটনার সময় প্রধানশিক্ষক শাহিন বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় উপস্থিতি স্বাক্ষর করলেও বাস্তবে তিনি কক্সবাজারে ছিলেন। অন্যদিকে নান্নু অসুস্থতার অজুহাতে ছুটি নিলেও পরিবারের সাথে একই ভ্রমণে তিনি অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি জানাজানি হলে নান্নু তিনদিনের নৈমিত্তিক ছুটি দেখিয়েছেন।
গৌরনদী উপজেলা শিক্ষক কর্মচারী কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের (কালব) সভাপতি সহকারী শিক্ষক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমি শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত সভাপতি হওয়া সত্তে¡ও পতিত সরকারের সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ চার নেতাকে দিয়ে এবং শাহিন মাষ্টার সাংবাদিকতার দাপট দেখিয়ে আমাকে একাধিকবার পদত্যাগের জন্য চাঁপ দিয়েছেন। তবে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে সহকারী শিক্ষক ফারহান হোসেন নান্নু বলেন, আমি আমার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। পত্রিকায় লোম্বা লিখলে কি হবে? অপর অভিযুক্ত প্রধানশিক্ষক মো. শাহিন উত্তেজিত হয়ে বলেন, আমি কোনো অনিয়ম করিনি। অনিয়ম-দুর্নীতি দেখা সাংবাদিকদের কাজ না।