পবিত্র রমজানের ইবাদত প্রসঙ্গ

এপ্রিল ১৫ ২০২১, ১৮:০৬

Spread the love

হাফেজ মুহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম: আরবি বর্ষের নবম মাস রমজান। মুসলিমদের কাছে এটি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সম্মানিত মাস। রোজার আরবি নাম সাওম বা সিয়াম। যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সবধরনের পানাহার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোজা। ইসলামের বিধান অনুসারে, প্রত্যেক সবল মুসলমানের জন্য রমজানে রোজা রাখা ফরজ বা অবশ্য পালনীয় ইবাদত।

পবিত্র কুরআন শরিফে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারেরা! তোমাদের জন্য রোজা/সিয়াম ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে করে তোমরা মুত্তাকি/তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)  মনে রাখতে হবে, রোজা বা সাওম তাদের ওপর ফরজ; যারা প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন ও শারীরিকভাবে রোজা পালনে সক্ষম। যদি কোনো ব্যক্তি সফর অবস্থায় থাকেন অথবা অসুস্থতার কারণে রোজা পালনে অক্ষম হন; তবে তিনি রোজা পরে কাজা আদায় করতে পারবেন। আর যদি কোনো ব্যক্তি সুস্থ হয়ে কাজা আদায় করার সুযোগ বা সামর্থ্য ফিরে না পাওয়ার আশঙ্কা করেন, তবে তিনি রোজার ফিদইয়া বা একজন গরিবকে এক ফিতরার সমান খাবার খাওয়াবেন অথবা প্রদান করবেন। । রহমত, ইবাদত আর মাগফেরাতের এ রমজান মাসে বেশকিছু ইবাদতে ব্যাপক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রমজানের তারাবি হলো সন্ধ্যাকলীন বিশেষ ইবাদত তথা নামাজ।

বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ সময়ে পবিত্র কুরআন খতমের মাধ্যমে এ নামাজ আদায় করা হয়। তারাবিহ নামাজের সময় মসজিদে ব্যাপক জনসমাগম হয়। বিশ্বব্যাপী লকডাউন পরিস্থিতি অতিবাহিত করছে মানুষ। বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে কোনো দেশই যথাযথ মর্যাদায় তারাবি নামাজ আদায় করতে পারবে না। তারাবির যে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সেটা কিছুটা ম্লান হবে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি করতে হবে। বাড়িতে কিংবা ঘরে একাকি স্বল্প পরিসরে বা বাসার সবাইকে নিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে তারাবির নামাজ।

এ জন্য এখন থেকেই প্রত্যেক মুমিন মুসলমানকে প্রস্তুতি নিতে হবে। করোনা সংক্রমণের কারণে এবার বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই চলছে লকডাউন। কেউ চাইলেও মসজিদে নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তাতে সবাইকে ব্যক্তি উদ্যোগে নিরাপদ পরিবেশে স্বল্প আকারে ঘরেই নামাজ আদায় করতে হবে।

পবিত্র রমজানে ব্যাপক জনসমাগমের মাধ্যমে অনেক ধর্মীয় আলোচনা কিংবা দোয়া অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। বিভিন্ন সংগঠন রমজান শীর্ষক আলোচনা ও ইফতার মাহফিল আয়োজন করে। অনেকে সেহরি রাত্রি নামের অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। এবারের রমজানে এসব অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকতে হবে। দুই. তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান।

এ মাসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দশ দিন রহমত, দ্বিতীয় দশ দিন মাগফেরাত ও মাসের তৃতীয় ও শেষ দশ দিন হচ্ছে নাজাতের। পবিত্র এ মাসে আল্লহ কুরআন নাজিল করেন। শবে কদরও রমজান মাসে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের মাস এ রমজান। রমজানের পরিপূর্ণ সুফল পেতে হলে চাই পরিপূর্ণ প্রস্তুতি। শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজন রমজানের বিশেষ ইবাদতের প্রস্তুতিরও। রমজান ও রোজা, তথা সিয়াম সাধনার বিধিবিধান, নিয়মকানুন, রীতিনীতি, মাসয়ালা মাসায়িল ভালোভাবে জেনে আমল করলেই রমজানের পরিপূর্ণ ফজিলত পাওয়া যাবে।

তা না হলে রোজা উপবাস ভিন্ন আর কিছুই নয়। রমজানে বিশেষ নফল আমলসমূহ হলো- পবিত্র কুরআন একাধিকবার খতম করা; কালিমা তৈয়্যেবা অধিক পাঠ করা; দরুদ শরিফ সর্বাধিক পরিমাণে পাঠ করা; তওবা ও ইস্তিগফার করতে থাকা; সর্বদা তসবিহ তাহলিল ও জিকির আজকার করতে থাকা; দ্বীনি শিক্ষা ও দ্বীনি দাওয়াতি কাজে মশগুল থাকা; ধর্মীয় বই-পুস্তক, কুরআন তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও ইসলামি সাহিত্য নিজে পড়া ও অন্যকে পড়তে সাহায্য করা; দীনি মজলিশ আয়োজন করা; অধীনস্থ কর্মচারী ও শ্রমিকদের কাজের চাপ কমিয়ে দেওয়া এবং তাদের পূর্ণ মজুরি ও অতিরিক্ত সম্মানী প্রদান করা; বেশি বেশি দান–খয়রাত করা ইত্যাদি (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, ইমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ৩৭, হাদিস: ৪৮, পৃষ্ঠা: ৩৮)।

এছাড়া রমজানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ওয়াজিব দুটি। যথা সদকাতুল ফিতর আদায় করা ও ঈদের নামাজ পড়া। ঈদের দিন সকালে যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বা অধিকারী থাকবেন, তিনি তার নিজের ও পরিবারের সব সদস্যের ফিতরা আদায় করবেন। যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না–ও থাকেন, তবু সুন্নত বা নফল হিসেবে হলেও সদকাতুল ফিতরা প্রদান করা উত্তম। উল্লেখ্য, হালাল বা বৈধ উপার্জন এবং হালাল রিজিক বা পবিত্র খাদ্য ছাড়া নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তিন. বৈশ্বিক এ মহামারি করোনায় লকডাউনে অবস্থান করছে পুরো বিশ্ব।

এরই মাঝে উপস্থিত হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এ মহামারি থেকে নিরাময় লাভ করতে এখনো কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। এর নেই কোনো কার্যকরী চিকিৎসা। এ থেকে মুক্ত থাকতে প্রয়োজন ঘরে অবস্থান করা। তাই এসময় মসজিদে নামাজ ও জামাত সীমিত রয়েছে। কেউ চাইলেও মসজিদে নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। তাতে সবাইকে ব্যক্তি উদ্যোগে নিরাপদ পরিবেশে স্বল্প আকারে ঘরেই নামাজ আদায় করতে হবে। পরিস্থিতির কারণে ঘরে কিংবা নির্জন পরিবেশে যথাযথ দূরত্ব বজায় রেখে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে ইতেকাফ করতে হবে। ইতেকাফে সীমাবদ্ধতারমজান মাসের অন্যতম ইবাদতের নাম ইতেকাফ। রমজানের শেষ দশকে মুমিন মুসলমান মসজিদে ব্যাপকভাবে ইতেকাফে অংশগ্রহণ করে।

বিশ্বের অনেক দেশেই মসজিদে ব্যাপকভাবে ইবাদতে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা। সে ক্ষেত্রে মসজিদে কোনো পুরুষই ইতেকাফ করতে পারবে না। লাইলাতুল কদর বা ২৬ রমজান দিবাগত রাতে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আগ্রহ উদ্দীপনার মাধ্যমে মানুষ ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করে। এ রাতের ইবাদত-বন্দেগির মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে কুরআন সুন্নায় অনেক দিক-নির্দেশনা রয়েছে। যৌথভাবে এ রাতের কোনো ইবাদত-বন্দেগিই অনুষ্ঠিত হবে না। ফলে নিজ নিজ উদ্যোগে যথাযথ দূরত্ব ও নিরাপত্তার মাধ্যমে এ মর্যাদাপূর্ণ রাতের ইবাদত সম্পন্ন করতে হবে। প্রতি বছর রমজানের শুরু থেকেই ঈদের প্রস্তুতিতে চলে কেনাকাটার ধুম। এমনিতে বড় মার্কেট বন্ধ রয়েছে। যদিও স্বল্প পরিসরে এসব মার্কেট খোলা থাকে তাতেও বিচরণ কিংবা যাওয়া আসায় ব্যাপক সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। তাছাড়া মসজিদে ইতেকাফ অসম্ভব হবে এই কারণে যে, সীমাবদ্ধতা থাকলেও মসজিদে ব্যাপক জনসমাগম হয়।

তাই মসজিদে ইতেকাফ করা হবে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। নারীরা এমনিতেই ঘরে ইতেকাফ করেন। সুতরাং তারা ঘরে একাকি সতর্কতা ও সচেতনতার সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ইতেকাফ করতে পারবেন। সর্বোপরি রমজান শেষে ঈদ উদযাপনেও থাকবে সীমাবদ্ধতা। ব্যাপক ও বড় আয়োজনে ঈদে নামাজেও থাকবে কড়াকড়ি। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা ইসতেগফার করতে হবে। মহামারি করোনা থেকে মুক্তির জন্য বিশ্ববাসীর জন্য তথা প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই দোয়া করা আবশ্যক। আল্লাহ বিশ্ববাসীকে প্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি দান করুন। রমজানের রহমত বরকত মাগফেরাতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের নাজাত লাভের তাওফিক এনায়েত করুন। আমিন।

হাফেজ মুহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম

মুহতামিম বরিশাল পলাশপুর রহমানিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা মাদ্রাসা