বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবিস্কার দৃষ্টিহীনদের জন্য ‘টকিংগ্লাস’

মার্চ ২৩ ২০২১, ০৯:৫১

Spread the love

॥ বায়োলজিক্যাল চক্ষু দেওয়া সম্ভব না হলেও অন্ধ ব্যক্তিরা টকিংগ্লাস (চশমা) পরে যেকোনো কিছু পরতে পারবেন। অন্ধ ব্যক্তির অবস্থানের লোকেশন, দিক-নির্ধারণ করে বলে দেবে চশমাটি। এছাড়া রাস্তায় হাঁটার সময় সামনে কিছু থাকলে তার দূরত্বসহ বলে দেবে, ব্যক্তির পরিচয়, টাকার নোটের মান বলে দেবে টকিংগ্লাস।

জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই প্রথম দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের জন্য ‘টকিংগ্লাস’ আবিস্কার করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের স্নাতকোত্তর তিন শিক্ষার্থী ও দুইজন শিক্ষক। এই নতুন উদ্ভাবনের অনুরূপ কোনো ডিভাইস বা প্রযুক্তি, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি বলে উদ্ভাবকদের দাবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি বিভাগের এটুআই’র ডিজেবিলিটি চ্যালেঞ্জ ফান্ডে ২০১৮ সালে এই প্রকল্পটি গৃহীত হয়। এরপর টানা দুই বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষনা শেষে এই প্রযুক্তির কার্যকরী ব্যবহারে সফল হন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টিম।

‘টকিংগ্লাস’র গবেষক টিমের সুপারভাইজার ববি’র কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, দুইজন শিক্ষক ও তিনজন ছাত্র মিলে মোট পাঁচজনের একটি টিম ‘টকিংগ্লাস’ নামে এটুআইতে আবেদন করেছিলাম। এরপর এটুআই থেকে ফান্ড পাওয়ার পর আমরা দীর্ঘদিন গবেষনা করে এখন চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছি। ‘টকিংগ্লাস’ ছয়টি ফিচার নিয়ে কাজ করছে। এখন এটাকে আরও ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও বলেন, বায়োলজিক্যাল চক্ষু দেওয়া সম্ভব না হলেও অন্ধ ব্যক্তি এই চশমা পরে যেকোনো কিছু পড়তে পারবেন। পাশাপাশি অন্ধ ওই ব্যক্তির অবস্থানের লোকেশন, দিক-নির্ধারণ করে বলে দেবে চশমাটি। এছাড়া রাস্তায় হাঁটার সময় সামনে কিছু থাকলে দূরত্বসহ বলে দেবে, ব্যক্তির পরিচয়, টাকার নোটের মান বলে দেবে টকিংগ্লাস। এটুআই’র উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথা অনুযায়ী টকিংগ্লাসে প্রাথমিকভাবে ছয়টি ইস্যু সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে দৃষ্টিহীনদের আরও যতো ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে পর্যায়ক্রমে তার সবগুলোই টকিংগ্লাসে যুক্ত করা হবে।

অধ্যাপক রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলেন, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ধরনের সেন্সর রাখা হয়েছে এই চশমার মধ্যে। এটা সাধারণ চশমার মতোই দেখতে হবে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রসেসিং উপাদান থাকবে। আমরা আর্টিফিশিয়াল থিংকিং ইন্টিলিজেন্স অ্যাপ্লাই করেছি। কারণ আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একজন দৃষ্টিহীন অন্ধ মানুষ যেন সাধারণের মতো সবকাজ করতে পারেন। আমরা চশমাটি স্থানীয় ব্লাইন্ড স্কুলের শিক্ষকসহ আরও কিছু লোক দিয়ে টেস্ট করেছি, তারাও এটা নিয়ে আশাবাদী। বর্তমানে অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমে স্থানীয় প্রোডাক্টগুলো আমরা সংযুক্ত করেছি। তবে প্লাস্টিক ও কাচের ফ্রেমে এবং ফিনিশিং প্রোডাকশনে যেতে হলে বড় কোনো কোম্পানির সাথে আলোচনা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ‘টকিংগ্লাস’ অন্ধ মানুষের জন্য একটি লাইভ শোনার যন্ত্র যা ব্যক্তির সামনে সবধরনের লেখা পড়তে পারে এবং যেকোনো বস্তু শনাক্ত করতে পারে। উদ্ভাবকরা এই ডিভাইসটিকে ‘টকিংগ্লাস’ নামকরণ করেছেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে টকিংগ্লাসে। ব্যবহারকারীরা এটা চশমা হিসেবে ব্যবহার করবেন। চোখের সামনে লেখার ওপর দৃষ্টি নিধারণ করা চশমায় সংযুক্ত থাকবে ক্যামেরা। ডিভাইসটি একটি স্থির চিত্র নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চিত্রের লেখা ব্যবহারকারীকে পড়ে শোনাবে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, টকিংগ্লাস ব্যবহারকারী দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা একজন স্বাভাবিক মানুষ যেভাবে বই পড়তে পারেন ঠিক একইভাবে উপযুক্ত গতিতে শুনতেও পারবেন। ভয়েস কমেন্টের মাধ্যমে ছবি সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য সেভ করে রাখা যাবে। এই চশমা ব্যবহারকারীর সামনে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু থাকলে নামসহ শনাক্ত করতে পারবেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা ব্যবহারকারীকে জানিয়ে দেবে।

প্রাথমিকভাবে টকিংগ্লাসে মোট ছয়টি ফিচার যুক্ত করা হয়েছে। যেগুলো হল-অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকোগনিশন (ওসিআর), ফেস রিকোগনিশন, অবজেক্ট ডিটেকশন, অবজেক্ট রিকোগনিশন, কারেন্সি রিকোগনিশন, ডিরেকশন ডিটেকশন, লোকেশন আইডেন্টিফিকেশন। টকিংগ্লাস মানুষের চেহারা চিহ্নিতকরণ এবং পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণসহ বিভিন্ন দিক নির্ণয়, কোনো বস্তু দেখলে তার নামসহ চিহ্নিতকরণ, বাংলা, ইংরেজী বইপড়া থেকে শুরু করে কোনটা কত টাকার নোট তাও নির্ণয় করতে পারবে।

‘টকিংগ্লাস’ উদ্ভাবক টিমে রয়েছেন-বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত হোসাইন ফয়সাল, সহকারী অধ্যাপক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, এ বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী সোহেল মাহমুদ, রিপন চন্দ্র দাস এবং ২০১৭-১৮ সেশসনের শিক্ষার্থী বিপুল মন্ডল।

টকিংগ্লাসের উদ্ভাবক কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল মাহমুদ বলেন, আমাদের ইচ্ছা এই ডিভাইসে আরও সুন্দর কিছু ফিচার যুক্ত করে খুব শীঘ্রই প্রত্যেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের কাছে পৌঁছে দেবো। ডিভাইসটি একজন ব্লাইন্ড হেল্পার হিসেবে কাজ করবে। যখন একজন অন্ধ ব্যক্তির কাছে কোনো মানুষ থাকবে না তখনো ওই ব্যক্তি নিজেকে স্বাবলম্বী ভাবতে পারবে। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা না হয়ে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি নিজ থেকে পথ তৈরি করতে পারবেন