ঢাকা মেডিকেলে তাদের আর নেতৃত্বে দেখতে চান না সাধারণ নার্সরা

জানুয়ারি ২৭ ২০২১, ১৭:৪৪

Spread the love

মুনিরুল তারেক:

বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশনের (বিএনএ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল শাখার নির্বাচনী হাওয়া বইছে সেখানকার নার্সদের মাঝে।করোনা পরিস্থিতি এবং সদ্য টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরুর কারণে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ না হলেও আগামী এক থেকে দু’ মাসের মধ্যেই নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ঢামেক হাসপাতালে সর্বাধিক সক্রিয় নার্সদের এই সংগঠনের আগামী নেতৃত্বে কে আসবেন, ইতোমধ্যে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন এ হাসপাতালের সাধারণ নার্সরা। তারা সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তাদের দাপ্তরিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নেতারা হস্তক্ষেপ করায় নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাদের। শুধুমাত্র নিজেদের আখের গোছানো নয়, নার্সদের যে কোনো সমস্যায় এগিয়ে আসা এবং নার্স সমাজের স্বার্থে কাজ করবেন, এমনই নেতাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চান সাধারণ নার্সরা। কেননা বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নানাবিধ অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কমিটির মেয়াদ উত্তীর্নের আনুমানিক আড়াই বছর হয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারণে নির্বাচন আটকে ছিলো। অনেক নার্সের বক্তব্য- সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অদৃশ্য ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচন আটকে রেখেছিলেন।

আসন্ন নির্বাচনে বর্তমান সভাপতি কামাল হোসেন পাটোয়ারী এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান জুয়েল একই পদে আবারো নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তাদের সহযোগী সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সাধারণ নার্সদের ভাষ্য- এই দুই নেতার স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্তি চান তারা। ঢামেক হাসপাতালের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সংগঠনের দায়িত্ব তাদের মত নেতার হাতে নার্সরা দিতে চান না, যারা কিনা সর্বদা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। নার্সদের জিম্মি করে, ভুলভাল বুঝিয়ে নানা কায়দায় পকেট ভারী করাই যাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। সংগঠনের পদ-পদবি ব্যবহার করে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর এবং ঢামেক হাসপাতালে অনিয়ম-দুর্নীতি করে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার বহু বছর ধরে।

সাধারণ নার্সদের অভিযোগ, এ হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের নিজেদের প্রাপ্য সরকারি সুবিধাগুলো পেতে হলেও এই নেতাদের কাছে ধর্না দিতে হয়। আর সেই সুযোগের সদব্যবহার করে ফাঁয়দা লোটেন তারা। আভ্যন্তরীন ও দূরের বদলি, লোকাল ও বিদেশ প্রশিক্ষণ, হজ্ব টিমে নাম অন্তর্ভুক্তি, দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে মাধ্যম ব্যবহার করে টাকা আদায়, ক্যান্টিনের অর্থ আত্মসাতসহ নানা অসদুপায়ে আর্থিকভাবে ফুলে-ফেপে উঠেছেন কামাল-জুয়েল। এছাড়া যে সেবামূলক চাকরি করার কারণে তারা এই সংগঠনের নেতা হয়েছেন, সে দায়িত্বও তারা পালন করেন না।

ঢামেক হাসপাতাল নার্সদের সূত্রে জানা গেছে, এ দুই নেতা হাসপাতালে যে ওয়ার্ড বা শাখায় দায়িত্বরত আছেন, সেখানে যান শুধু চেহারা দেখাতে। রাজনীতি করতে গিয়ে তারা ভুলেই গেছেন অন্য সবার মত তারাও নার্স। তাদেরও ডিউটি আছে। শুধুমাত্র স্বাক্ষর করেই কর্মস্থলের দায়িত্ব শেষ করে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে এই নেতাদ্বয়। সাধারণ নার্স কর্মকর্তাদের এক কথায় ভাষ্য হচ্ছে- ঢামেক হাসপাতালে কর্মরত নার্সরা স্বেচ্ছাচারী বিএনএ নেতাদের কাছে জিম্মি। এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে নতুন নেতৃত্ব ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না তারা।

নার্সদের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, স্বাস্থ্য সেক্টরের উচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ঘেষা কর্মকর্তারাই এই দুই বিএনএ নেতার টিকে থাকার খুঁটি। কিন্তু এরা কেউই মূলত আওয়ামী রাজনীতির অনুসারী নন। তাদের ইতিহাস ঘেটে এমনটাই জানা গেছে।

অনেকে বলছেন, ঢামেক হাসপাতালের নার্স সংগঠনে ‘আওয়ামী লীগের মোড়কে বিএনপির আধিপত্য’ চলছে।

এ প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ সম্পাদক মোঃ আসাদুজ্জামান জুয়েল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন সম্বলিত ব্যানারের একটি মিছিলে সামনের কাতারে রয়েছেন। অপর এক ছবিতে দেখা যায়, একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের পাশে বসে আছেন তিনি। অথচ এই জুয়েলই নিজেকে এখন আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। দলের বিভিন্ন দিবস কিংবা কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে সরকারি দলের লোক হিসেবে নিজেকে জাহির করে অবৈধ নানা সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন।

এছাড়া সভাপতি মোঃ কামাল হোসেন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালককে ফাঁসাতে বঙ্গবন্ধুর ছবির অবমাননার অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় কামালসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, তিনি যদি আওয়ামী লীগপন্থি হয়ে থাকেন তাহলে কিভাবে একটি ষড়যন্ত্রমূলক কাণ্ড ঘটাতে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করলেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- জাতির পিতার ছবি নিয়ে “নয়ছয়” করে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন এই নার্স নেতা। ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কামাল পাটোয়ারীকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেন নার্সিং অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক আলম আরা বেগম। চিঠিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ১০ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু কামাল পাটোয়ারী অদৃশ্য ক্ষমতা ব্যবহার করে গুরুতর এই অভিযোগের দায় থেকে বেঁচে গেছেন। উল্টো ওই মহাপরিচালককেই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কামাল পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে এসব ছাড়াও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম অভিযোগ হচ্ছে- প্রতি বছর সরকারিভাবে প্রেরিত হজ্ব যাত্রীদের সঙ্গে মেডিকেল টিমে একজন নার্স কর্মজীবনে একবারই যেতে পারবেন। জনশ্রুতি রয়েছে- কামাল পাটোয়ারী অন্তত ৫ বার হজ্ব টিমে গিয়েছেন। আরো বেশিবার গিয়েছেন বলেও অনেকের মন্তব্য। তবে কামাল পাটোয়ারী স্বীকার করেছেন যে তিন বার গিয়েছেন তিনি।

সকল অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে এ দুই নার্স নেতার মুঠোফোনে কল করলে তারা রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।