বহাল তবিয়তে বরিশাল ডিসি অফিসের নাজির হাবিবুর

নভেম্বর ২৪ ২০২০, ০৪:২৫

Spread the love

 আকতার ফারুক শাহিন:
facebook sharing button
messenger sharing button
twitter sharing button
pinterest sharing button
linkedin sharing button

বেপরোয়া দুর্নীতির অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে বরিশালের ডিসি অফিসেই প্রেষণে নাজিরের দায়িত্ব পালন করছেন সার্টিফিকেট সহকারী হাবিবুর রহমান। সম্পদের বিবরণ চেয়ে দুদকের নোটিশ আর কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার বিস্তর অভিযোগের পরও যেন তাকে ছাড়া চলছেই না এ দফতরের নাজিরের কাজ। অভিযোগ রয়েছে, কতিপয় কর্মকর্তার অবৈধ অর্থ আয়ের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হওয়ায় এত অভিযোগ সত্ত্বেও হাবিবেই খুশি ডিসি অফিসের কর্তাব্যক্তিরা।

দুদক সূত্র জানায়, নাজির হাবিবের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত অনেকটাই শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বহু প্রমাণ মিলেছে। দ্রুত হাবিবের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমতি চাওয়া হবে।

সাকুল্যে বেতন ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার ২০০ টাকা জমা রাখেন ভবিষ্যতহবিলে। বাকি ১৪ হাজার ৮০০ টাকায় কেবল ৪ জনের সংসার চালানোই নয়, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অলিশান বাড়িসহ হাবিবুর কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। কোন আলাদিনের চেরাগের বলে এতকিছু করলেন হাবিব তার অনুসন্ধান শুরু হয় চলতি বছরের মার্চে। দুদক ১০ মার্চ তাকে নোটিশ পাঠায়। নোটিশ প্রাপ্তির ৫ মাস পর ৯ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে সম্পদের বর্ণনা দাখিল করেন হাবিব। সেই বর্ণনাতেই মিলেছে হাবিবের বিপুল সম্পদের সন্ধান, যা মোটেই তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এর বাইরে তার আরও অনেক সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক।

এসব অভিযোগ অবশ্য স্বীকার করেননি প্রেষণে নাজির পদে থাকা হাবিবুর। বৈধ আয়েই জমি-বাড়ি করেছেন বলে দাবি তার। ১৯৯১ সালে বরিশালের বাকেরগঞ্জে সার্টিফিকেট সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন হাবিবুর। সেই থেকে একই পদে থাকলেও প্রায় ৩ বছর আগে প্রেষণে তাকে বরিশাল ডিসি অফিসের নাজিরের দায়িত্বে আনা হয়। এ প্রেষণের বিষয়টিকেও অবৈধ বলছে খোদ ডিসি অফিসেরই কর্মচারীরা।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ডিসি অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৯ সালে হাবিবুরের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণসহ সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বাকেরগঞ্জের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আবদুল তারিক। এ বিষয়ে তদন্তও হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। হাবিবুর বলেন, সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে।

চাকরি-জীবনের শুরু থেকে একের পর এক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা হাবিবুরের একচ্ছত্র অধিপত্য ডিসি অফিসে। প্রায় সবক্ষেত্রে যেন হাবিবই শেষ কথা। ডিসি অফিসের নানা ক্রয় ও সাধারণ মেরামতের ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সম্পদের বর্ণনায় নগরীর বগুড়া-আলেকান্দা মৌজায় ৬ ও সোয়া ৪ শতাংশের দুটি প্লটের কথা উল্লেখ করেছেন হাবিবুর। এ সোয়া ১০ শতাংশের জমির দাম বলা হয়েছে ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ভূমি অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বগুড়া-আলেকান্দা মৌজায় প্রতি শতাংশ জমির সরকার নির্ধারিত মূল্যই ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩০৭ টাকা। এ হিসাবে আলোচ্য সোয়া ১০ শতাংশ জমির মূল্য ৫৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। বরিশাল সদর উপজেলার চর আইচা এলাকায় থাকা ৩৩ শতাংশ জমির দাম বলা হয়েছে মাত্র ৩৩ হাজার টাকা। অথচ এখানে জমির দামের সরকার নির্ধারিত রেট হচ্ছে প্রতি শতাংশ ৫০ হাজার। সেই হিসাবে জমির মূল্য দাঁড়ায় ১৬ লাখ টাকারও বেশি। এসব জমি ক্রয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে হাবিবুর বলেন, ‘২০/২২ বছর আগে চরআইচা মৌজার ৩৩ শতাংশ জমি কিনেছি। তখন মৌজা রেট কম ছিল। আলেকান্দা মৌজায় যে ৬ শতাংশ জমি রয়েছে তা কেনা হয়েছে ২০০৩ সালে। নগরীর আর্শেদ আলী কন্ট্রাক্টর গলিতে আমার কিছু জমি ছিল। ওই জমি বিক্রি এবং তার সঙ্গে আরও কিছু টাকা জমিয়ে এই ৬ শতাংশ জমি কিনেছি। তাছাড়া বাকি যে সোয়া ৪ শতাংশ জমি তা সঞ্চয়ের টাকায় কেনা।’ ২০ হাজার টাকা বেতনের ৫ হাজার ২শ’ টাকা ভবিষ্যতহবিলে রেখে বাকি টাকায় সংসার পরিচালনা, ছেলেকে ঢাকায় পড়ানো আর মেয়ের লেখাপড়ার পরও কী করে জমি কেনার এই টাকা সঞ্চয় করলেন জানতে চাইলে অবশ্য কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এসব জমিই কেবল নয়, আলেকান্দা কাজীপাড়া এলাকায় থাকা ৬ শতাংশ জমির ওপর একটি আলিশান ভবন নির্মাণ করেছেন হাবিবুর। এ ভবন কিংবা এর ভাড়া বাবদ মাসে যে ৬০/৭০ হাজার টাকা আয় তার কোনোকিছুই আয়কর রিটার্নে দেখাননি হাবিবুর। বিষয়টি সম্পর্কে হাবিবুর বলেন, ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০১২ সালে সম্পন্ন হয় এ ভবন। এ বছরই ভবন নির্মাণের ব্যয় নিরূপণ করে এটি আয়কর ফাইলে সংযুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণে হাউসবিল্ডিং ফাইন্যান্স থেকে ২৫ লাখ টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংক এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নেয়া ধারসহ আমার মোট ঋণের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। তাছাড়া আমার স্ত্রীও সরকারি চাকরি করে। তার আয়ের অংশও রয়েছে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দুদকের একটি সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে তাতে নাজির হাবিবুর ও তার স্ত্রীর সমন্বিত বৈধ আয়ের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। ধার নেয়ার ক্ষেত্রে এখন ব্যাংকিং নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়। তিনি তা করেননি। ২০১২ সালে যদি বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ হয়, তাহলে টানা ৮ বছর ভাড়া বাবদ আয় হওয়া টাকার তথ্য গোপন রাখাও অপরাধ।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া দুদকের সহকারী পরিচালক রনজিৎ কুমার কর্মকার। বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, তার কর্মকালীন ৩ বছর এখনও সম্পন্ন হয়নি। ৩ বছর হওয়ার আগে বদলি করা বাধ্যতামূলক নয়। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে তখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।