বরিশাল সিটির সাবেক কাউন্সিলর রূপার মামলার অভিযোগ নিয়ে ধুম্রজাল

নভেম্বর ২১ ২০২০, ০৯:৩১

Spread the love

মুনিরুল তারেক:

বরিশালে এই মুহূর্তে আলোচিত বিষয় হচ্ছে আবু তাজিন মোল্লা নামক যুবকের বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ইসরাত আমান রূপা’র মামলা দায়ের। তবে যার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন রূপা, গত কয়েক বছর ধরে সেই যুবকের সঙ্গে রূপার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করেছে বরিশালবাসী। প্রকাশ্যেই তারা মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন বিনোদন স্পটে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে অসংখ্য ছবি। যাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। তাহলে সময়ের ব্যবধানে এখন কেন বিষয়টি মামলা পর্যন্ত গড়ালো?

শুরুতেই উল্লেখ করা যায়, যুবতী বয়সের রূপা বরিশার সিটির সাবেক একজন প্যানেল মেয়রের সঙ্গে প্রেম এবং মাদক সংক্রান্ত ঘটনায় বিতর্কিত হিসেবে বেশি পরিচিত বরিশালের মানুষের কাছে। ওই প্যানেল মেয়রের সঙ্গে দীর্ঘ দিন প্রেম, বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরির পরে তাকে বিয়ে না করতে আত্মহত্যার চেষ্টাসহ বহু ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। এছাড়াও রূপার বিরুদ্ধে রয়েছে মান্না পাহাড়ি নামের এক সাপুড়েকে ভাড়াটে লোক দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে নৃশংস হামলার অভিযোগ। হত্যা চেষ্টা মামলায় রূপাকে কারাগারেও যেতে হয়েছিলো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংগৃহীত ছবি

তাজিন মোল্লার বিরুদ্ধে করা মামলায় সাবেক কাউন্সিলর রূপা অভিযোগ করেছেন, দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে তার আত্মীয় স্বজন রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নানা বাড়ির সম্পত্তি দেখাশোনা করতে পারেন না। ফলে এ সকল সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য তাজিন নামে একজনকে তিনি দায়িত্ব দেন। তাজিন নিজেকে সৎ প্রমাণ করে বিভিন্ন কৌশলে তার কাছ থেকে নগদ টাকা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন দামী জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। একপর্যায়ে তাজিন গোপনে রূপার শয়নকক্ষে ক্যামেরা বসিয়ে ব্যক্তিগত মুহুর্তের ভিডিও ধারণা করে। তা দেখিয়ে রূপার কাছ থেকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ৫ লাখ টাকা দাবি করে। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর কোতয়ালি মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেন রূপা। তাজিন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করে দিয়ে সাধারণ ডায়েরি প্রত্যাহার করে নেন তিনি।

তবে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুব একটা নেই বলা যায়। মামলায় রূপা বলেছেন, তিনি ব্যস্ত থাকায় নানা বাড়ির সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য অর্থাৎ কেয়ারটেকারের দায়িত্ব দিয়েছেন তাজিনকে। তাহলে যাকে কেয়ারটেকার নিয়োগ করেছেন, তার সঙ্গে কেন রূপা বরিশাল এবং বরিশালের বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন? শুধু ঘুরে বেড়ানোই নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। যদি রূপার সম্মতি ছাড়া তাজিন মোল্লা সেসব ছবি পোস্ট করে থাকেন, তাহলে এত দিনে কেন ব্যবস্থা নেননি?

আরো অভিযোগ করা হয়, ‘তাজিন নিজেকে সৎ প্রমাণ করে বিভিন্ন কৌশলে তার কাছ থেকে নগদ টাকা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন দামী জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়েছে’। তবে এ বিষয়ে তাজিন জানালেন উল্টো কথা। তিনি জানান, রূপা আরো তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়েছিলো। তবে পরবর্তীতে মোটরসাইকেল ক্রয়ের জন্য ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আনুমানিক তিন লাখ নিয়েছেন তিনি। এখনো ২ লাখ টাকা পাওনা আছে রূপার কাছে।

এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ডকুমেন্টও রয়েছে (ভিডিওটি সংবাদের নিচে দেয়া আছে)। যাতে দেখা যাচ্ছে, ভিডিওতে উপস্থিত আছেন তাজিন মোল্লা, ইসরাত আমান রূপা ও সায়মন আহমেদ কালু নামের এক যুবক। এতে তাজিন রূপাকে বলছেন, আমি তোমার কাছে ২ লাখ টাকা পাই। এর মধ্যে কালু ৫০ হাজার টাকা কাল বিকেল সাড়ে ৫ টায় দেবে। রূপাও তাজিনের কথায় সম্মতিসূচক ভঙ্গি করেছেন। এ ভিডিও দ্বারা স্পষ্ট যে, রূপা পান না, উল্টো তাজিন রূপার কাছে ২ লাখ টাকা পান।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংগৃহীত ছবি

রূপার আরো অভিযোগ হচ্ছে, ‘তাজিন গোপনে রূপার শয়নকক্ষে ক্যামেরা বসিয়ে ব্যক্তিগত মুহুর্তের ভিডিও ধারণা করে। তা দেখিয়ে রূপার কাছ থেকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ৫ লাখ টাকা দাবি করে’। এ ঘটনা ঘটেছে বলে রূপা দাবি করলেও এর সঠিক কোনো তথ্য প্রমাণ দিতে পারেননি রূপা।

তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র ২৪ সেপ্টেম্বর কোতয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করেন রূপা। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য। রূপা মিথ্যা অভিযোগে জিডি করবেন আঁচ করতে পেরে আবু তাজিন মোল্লা তার এক দিন আগেই, অর্থাৎ ২৩ সেপ্টেম্বর কোতয়ালি মডেল থানায় জিডি করেন rima islam নামের ফেসবুক আইডি থেকে তাদের (তাজিন-রূপা) ছবি প্রকাশ করা নিয়ে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় সামনে এসেছে। এক হচ্ছে- তাজিন যদি নিজেই গোপন ছবি বা ভিডিও করতেন তাহলে তিনি আইনের আশ্রয় নিতে আগে যেতেন না। দ্বিতীয়ত, ছবিগুলোতে যেহেতু তারা দু’জনেই হাসিখুশি ভঙ্গিতে ঘনিষ্ঠভাবে উপস্থিত, সেক্ষেত্রে যৌথ সম্মতিতে তোলা ছবি নিয়ে অভিযোগ করারও সুযোগ নেই।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে ইসরাত আমান রূপার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে (০১৭৪৬-৮৪**৮১) কল করা হলে তিনি রিসিভ না করায় তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বরিশালের পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ

উল্লেখ্য, ইসরাত আমান রূপা’র বিরুদ্ধে বরিশাল নগরীতে বহুবিধ জনশ্রুতি রয়েছে। একাধিক বিয়ে, প্রশাসন ও রাজনীতি অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে অনৈতিক সখ্যতাসহ আরো বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয়গুলো অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সাপুড়ে মান্না পাহাড়িকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়ার অডিও রেকর্ডও ফাঁস হয়েছিলো। সকল বিষয় নিয়ে বরিশালের গণমাধ্যমে অসংখ্যবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন ইসরাত আমান রূপা। এসব কারণে ব্যক্তি ইমেজ শেষ হয়ে যাওয়ায় একবার কাউন্সিলর হওয়ার পর দ্বিতীয়বার আর নির্বাচনে অংশও নেন তিনি।

সায়মন আহমেদ কালু নামের ওই যুবকও জানিয়েছেন, তিনিও রূপার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ২০১৯ সালে ইসরাত আমান রূপা লঞ্চের টিকেট মাস্টার সাইমুন আহমেদ কালুর বিরুদ্ধে ১ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন। রূপা নগরীর ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকার মোঃ বাদশা আমানউল্লাহর মেয়ে রুপা এবং সায়মন আহমদ কালু ১৫ নং ওয়ার্ডের ফরেস্টার বাড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের ছেলে।

রূপা বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, লঞ্চের টিকেট মাস্টার সাইমুন আহমেদ কালুকে ব্যবসায়িক সূত্রে বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তা করেন তিনি। সে টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করছে এবং টাকা চাইতে গেলে প্রাণে মারার হুমকি দিয়েছে।

তবে, সায়মন আহমেদ কালু তখন বরিশালের সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন গুজব। সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে আমি তাকে চিনি, তাই শ্রদ্ধার সঙ্গে যে কোনো কাজ করে দিয়েছি, এটাই ছিলো আমার সবচেয়ে বড় ভুল। আমার শ্রদ্ধা সম্মানকে দুর্বলতা ভেবে একসময় আমার দেওয়া ঋণ পরিশোধ না করে আরো টাকা নেওয়ার জন্য চাইলে আমি দিতে রাজি হইনি। এরপর থেকে কাউন্সিলর রূপা লঞ্চের ভিআইপি সিট বুকিং করে ভাড়া ছাড়া যাতায়াত শুরু করেন। এই থেকে তার সঙ্গে আমার দূরত্ব শুরু হয়।

এক দিন রূপা শহরের একটি হোটেলে আসার জন্য আমাকে অনুরোধ করলে আমি আসলেই আমাকে কয়েকজন লোক ঘেরাও করে ভিডিও করার প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আসি, রূপার নেতৃত্বের এহেন অপকর্মের হুমকিতে লঞ্চের চাকরি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াই।

বরিশালের ওই সংবাদপত্রে আরো লেখা হয়, রূপা প্রেমের মহান সাগর। তাঁর প্রেমে জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন মহলের লোকজন রয়েছে, কারণে-অকারনে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে। ভয়ংকর রূপা নিজের রূপের ফাঁদে অনেককে নির্যাতনের শিকার করে কিন্তু ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ তারা।

খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, অন্তত ১০ বছর পূর্বে নগরীর ভাটিখানা এলাকার এক প্রবাসীর সাথে বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে প্রথম বিয়ের পিড়িতে বসেন তিনি। তার সকল অর্থ আত্মসাৎ করে সেও নির্যাতিত হয়ে সংসার ত্যাগ করে। বর্তমানে তিনি তৃতীয় স্বামীর সংসার রয়েছেন। রূপার এহেন অপকর্মের কারণে পুরো এলাকা ক্ষিপ্ত রয়েছে। আমেরিকা প্রবাসী লিটন বলেন কৌশল অবলম্বন করে রূপার খপ্পর থেকে সরে আসছি, না হয় আলোচনা সামালোচনায় পড়তে হতো আমায়। এমন অভিযোগ অনেক রয়েছে তার বিরুদ্ধে । বিদেশি ও সম্পদশলীদের অর্থ আত্মসাতের ধান্দা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তিনি।